বিসর্জন – একটি আবেগঘন বাংলা গল্প | সুজয় মুখার্জী
বিসর্জন
পড়ন্ত বিকেলের দৃশ্য
পড়ন্ত বিকেল । অস্তগামী সূর্য । বিকেল এলেই একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা গ্রাস করে আকাশ কে । হয়তো ক্রমশ নিকষ কালো আঁধারে ঢাকা পড়া আকাশ ওর মনটাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে । বিছানায় বসে বাইরের এক চিলতে খোলা জায়গার দিকে তাকিয়ে ছিল আকাশ । পাশের পাড়ার জয়কিষেন আর ফুলমতিয়ার ছেলে দুটো ক্রিকেট খেলছিলো । সম্বল বলতে ভাঙা তক্তাপোশের একটা পায়া আর একটা চটা ওঠা প্লাস্টিকের বল । ওতেই ওদের যা আনন্দ, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না ।
আকাশ
এই গল্পের প্রধান চরিত্র। প্রাক্তন শিক্ষক, সৃষ্টিশীল মানুষ, জীবনকে গভীরভাবে উপভোগ করতে চান। অসুস্থতার সাথে লড়াই করছেন কিন্তু মনোবল অটুট।
অথচ একটা সময় এই বিকেলবেলা গুলো স্বপ্নের মতো কেটেছে আকাশের । সন্ধ্যা নেমে আসার আগে পর্যন্ত মাঠে বল পেটানো, খেলা শেষে বাড়ি ফিরে মা র বকুনি শুনতে শুনতেই কোনোমতে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যাওয়া । ছোটবেলার কথা মনে পড়তে অজান্তেই হাসি খেলে যায় আকাশের রোগ জর্জরিত শীর্ণ মুখে । একটু যেন হালকা লাগে বুকের ভেতরটা । যেন একটা বোঝা নেমে যায় ।
আকাশের জীবনপথ
শিক্ষাজীবন ও চাকরি
কলেজ পাশ করে কিছুদিন বেসরকারী জায়গায় কাজ করেছিল আকাশ । দুবছরের মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল আকাশ । সরকারী চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই শিক্ষকতার চাকরির নিয়োগপত্র পেয়ে যায় আকাশ ।
সফল শিক্ষকতা
তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে । সবার সাথে মিশে যাওয়ার সহজাত ক্ষমতা আর বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ জ্ঞান - অল্প সময়ের মধ্যেই আকাশ স্যারের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছিল ।
অপরুপার সাথে সাক্ষাৎ
একটা সেমিনারে গিয়ে আকাশ এর সাথে আলাপ হল অপরুপার । কথায় কথায় জানতে পারল আকাশ, যে অপরুপা বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্যে নিবেদিত প্রাণ ।
বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা
দুজনের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে সময় নেয়নি । আস্তে আস্তে দুজনে বুঝতে পারছিলো যে জীবন কে অনেক কিছু দেওয়ার আছে তাদের দুজনেরই - একসাথে ।
অপরুপা
বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ছবি আঁকার ভীষণ সখ। আকাশের জীবনসঙ্গী ও মানসিক সমর্থন।
সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল । কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন । বিধাতা পুরুষ হয়তো তাৎক্ষণিক ভালোবাসা আর পার্থিব সুখের আড়ালে অন্য চিত্রনাট্য রচনা করেই রেখেছিলেন ।
অসুস্থতার শুরু
হঠাৎ বছর খানেক আগে পুজোর ঠিক মুখে মুখে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পর আকাশের শরীর টা খুব খারাপ হয়ে পড়ে । দুর্ভাগ্যবশত তখন কেউ বাড়িতে ছিলো না । দু একবার বমির সাথে বেসিনে রক্তের দাগ দেখে প্রমাদ গুনেছিল আকাশ । তার আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না অচিরেই তা জানা গেছিলো । বিভিন্ন পরীক্ষার পর জানা গেল যে মারণ রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে । শুরু হলো লড়াই ।
পূজার দিনগুলো
দেখতে দেখতে আরও একটা পুজো এসে গেলো । মহালয়ার ভোরে উঠে ৪ টে নাগাদ রেডিও র নব ঘোরাতেই বেজে উঠলো সেই অমোঘ বাণী "আশ্বিনের শারদ প্রাতে" । দুচোখ জলে ভরে গেলো আকাশের । আজকাল অপরুপার সামনে সবসময় হাসিখুশী থাকার চেষ্টা করে আকাশ । ওকে বুঝতে দেয় না তার ভেতরে কি চলছে ।
মহালয়ার পর পুজো আসতে সময় লাগেনা । ওইটুকু সময় চোখের নিমেষে কেটে যায় । পুজো প্যান্ডেল গুলোতে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে ওঠে । অশক্ত শরীর নিয়ে রোজ পাড়ার প্যান্ডেলে যায় আকাশ । অসহনীয় যন্ত্রনা থেকে মুক্তির দিশা খোঁজে । মা দুর্গার মুখের দিকে তাকিয়ে আবিষ্ট হয়ে যায় । মনের মধ্যে উথালপাথাল হয় আকাশের, মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে, "মা, আমার যে অনেক কিছু করা বাকী, আমার যে যাওয়ার সময় হয়নি মা" ।
শেষ রাতের স্বপ্ন
নবমীর রাত টা এমনিতেই মন খারাপ থাকে সবার । আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা তারপরেই মা পাড়ি দেবেন কৈলাসের পথে । রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল আকাশ । দেখল ছোটবেলার বন্ধু দের সাথে যেমন মাঠে কাশফুল নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতো, সেরকমই একরাশ কাশফুল হাতে নিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরুপা, খোলা মাঠ, মাথার ওপর নীল আকাশ, ঢাকের আওয়াজ, সেই ছোটবেলার দুর্গা পুজোর আমেজ টের পাচ্ছিলো আকাশ স্বপ্নের মধ্যেও ।
শেষ মুহূর্ত
আচমকা ঘুম টা ভেঙ্গে গেলো কার ডাকে, উঠতেই দেখল সকাল হয়ে গেছে, অপরুপা এসেছে, তাকে ডাকছে । মা কাকিমারা গেছেন প্যান্ডেলে । শাস্ত্রীয় মতে দর্পণে বিসর্জন হবে মা র । অপরুপা কে বললো আকাশ, "যখন নীরবে দূরে" গান টা একটু গাও, শুনি । আকাশের মাথার কাছে বসে গাইতে থাকল অপরুপা ।
ওদিকে প্যান্ডেলে বেজে উঠেছে বিসর্জনের বাজনা । বেদনাময় এক আবেশ চারিদিকে, মা র বিসর্জনের সাথে সাথে জীবন প্রদীপ নিভে গেলো আকাশের । কোনও সারা না পেয়ে গান থামিয়ে অপরুপা দেখল, নিথর হয়ে যাওয়া আকাশের মুখময় বিরাজ করছে এক স্বর্গীয় হাসি । কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল অপরুপা ।
ওদিকে নশ্বর দেহ ত্যাগ করে আকাশ তখন ছুটে বেড়াচ্ছে মাঠ ভরা কাশফুলের মাঝে, যেখানে নেই কোনও ব্যাধি, নেই কোনও জরা, আছে শুধু মুক্তির আনন্দ ।
Comments
Post a Comment